ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস। দ্বিতীয় পর্বঃ খাদের কিনারে

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস

কালো মাস্ক পরা লোকটির পিস্তলের নল জাওয়াদের কপালে একদম স্থির। জাওয়াদের হৃৎপিণ্ড হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ করছে, কিন্তু সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। সে জানে, ভয় পেলে বুদ্ধি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মনে মনে সে আয়াতুল কুরসি পাঠ করল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি তার শিরায় উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল

"হাত উপরে তোলো!" লোকটা হিসহিসিয়ে বলল

জাওয়াদ ধীরে ধীরে হাত উপরে তুলল। কিন্তু তার ডান হাতের আঙুলগুলো খুব সন্তর্পণে ল্যাপটপ ব্যাগের সাইড পকেটে থাকা একটি ছোট ডিভাইসের দিকে এগোল। ওটা তার নিজের বানানো একটি হাই-ফ্রিকোয়েন্সি সাউন্ড পালসার

"তুমি কে? এখানে কী করছো?" মাস্কধারী লোকটা জাওয়াদকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল

ভেতরে সেই ছদ্মবেশী 'ইমাম' এবং ডক্টর আশরাফ তখনো সেখানেই। জাওয়াদকে দেখে ডক্টর আশরাফের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কের ঝিলিক খেলে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে নিলেন

"আরেকটা ইঁদুর ধরা পড়েছে দেখছি," ছদ্মবেশী লোকটি শীতল হাসল। তার চোখের চাহনি এখন শিকারি বাজের মতো ধারালো। "শোনো খোকা, এটা তোমার পাড়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়। এখানে প্রাণের কোনো দাম নেই।"

জাওয়াদ লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "আপনি যেই হোন, আল-আমিনের বেশ ধরে আমানতদারি ভঙ্গ করছেন। একজন আলেম কখনও নিরপরাধ মানুষের ওপর অস্ত্র তোলে না।"

"বক্তৃতা বন্ধ করো!" লোকটি গর্জে উঠল। সে ডক্টর আশরাফের দিকে ফিরে বলল, "ডক্টর, এই ছেলের জীবনের বিনিময়ে কি আপনি সেই কোডটা দেবেন? নাকি আমরা আমাদের পদ্ধতিতে কাজ শুরু করব?"

ডক্টর আশরাফ মাথা নিচু করে রইলেন। তার কপালে ঘাম জমেছে। জাওয়াদ বুঝতে পারল, ডক্টর আশরাফ এমন কিছু জানেন যা দেশের বা উম্মাহর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিটি আসলে কোনো সাধারণ বই নয়, বরং সেটি একটি এনক্রিপ্টেড ম্যাপ যা প্রাচীন ইসলামী বিজ্ঞানের কোনো এক গোপন আবিষ্কারের চাবিকাঠি

হঠাৎ জাওয়াদের ল্যাপটপ ব্যাগ থেকে একটা তীক্ষ্ণ বিপ-বিপ শব্দ শোনা গেল

"ওটা কী?" মাস্কধারী লোকটা চমকে উঠল

"আমার ল্যাপটপের ব্যাটারি ওভারহিট হচ্ছে," জাওয়াদ খুব স্বাভাবিকভাবে বলল। "আপনারা যদি আমাকে ওটা বন্ধ করতে না দেন, তবে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।"

আসলে জাওয়াদ তার মোবাইল থেকে রিমোটলি পালসার ডিভাইসটি চালু করে দিয়েছে। লোক দুজন একে অপরের দিকে তাকাল। ছদ্মবেশী 'ইমাম' মাথা নাড়ল। মাস্কধারী লোকটা জাওয়াদকে ব্যাগের কাছে যেতে ইশারা করল

জাওয়াদ ব্যাগের চেইন খোলার ভান করে হঠাৎ ডিভাইসটির সুইচ টিপে ধরল

পরক্ষণেই এক কানফাটানো অতিপ্রাকৃতিক উচ্চশব্দ (High-frequency sound) ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষের কানে এই শব্দ অসহ্য যন্ত্রণা তৈরি করে। লোক দুজন আর্তনাদ করে কানে হাত দিয়ে বসে পড়ল। পিস্তলটা মাস্কধারী লোকটার হাত থেকে ফসকে মেঝের ওপর পড়ল

"ডক্টর! এখনই!" জাওয়াদ চিৎকার করে উঠল

জাওয়াদ দ্রুত ডক্টর আশরাফের হাতের বাঁধন খুলে দিল। ডক্টর আশরাফ টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন। জাওয়াদ দ্রুত মেঝের পিস্তলটা লাথি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু সে জানে এই শব্দ বেশিক্ষণ তাদের আটকে রাখতে পারবে না

"দ্রুত চলুন ডক্টর, পেছনের জানালা দিয়ে নামতে হবে!" জাওয়াদ ডক্টরের হাত ধরে জানালার দিকে ছুটল

জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই জাওয়াদের বুক কেঁপে উঠল। নিচে অন্ধকার গলি, আর সেখান দিয়ে একদল কালো পোশাকধারী লোক দ্রুত এই দালানের দিকেই আসছে। তাদের হাতে টর্চলাইট আর অস্ত্র

"জাওয়াদ, ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি!" ডক্টর আশরাফ হাঁপাচ্ছেন। "তুমি চলে যাও। আমাকে নিয়ে ওরা বেশিদূর যেতে পারবে না। কিন্তু এই পেনড্রাইভটা..." ডক্টর তার পাঞ্জাবির ভেতর থেকে একটা ছোট রুপালি পেনড্রাইভ বের করলেন। "এটা কোনোভাবেই ওদের হাতে পড়তে দেওয়া যাবে না।"

ঠিক তখনই দরজার ওপাশে ধস্তাধস্তির শব্দ শোনা গেল। ছদ্মবেশী লোকটি শব্দ সহ্য করেই উঠে দাঁড়িয়েছে। তার মুখ ক্রোধে লাল হয়ে গেছে। সে পকেট থেকে একটি ছোট ছোরা বের করে জাওয়াদের দিকে ছুড়ে মারল

জাওয়াদ সরে দাঁড়াল, কিন্তু ছোরাটা তার পাঞ্জাবির হাতা কেটে দেয়ালে বিঁধে রইল

"পালাও জাওয়াদ! আল্লাহর ওপর ভরসা করো!" ডক্টর আশরাফ জাওয়াদকে জানালার কার্নিশের দিকে ধাক্কা দিলেন

জাওয়াদ কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়ল। ঠিক তখনই ঘরের দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢুকল একদল সশস্ত্র কমান্ডো। তাদের জ্যাকেটে একটি বিশেষ চিহ্ন— একটি নীল রঙের তারকা

জাওয়াদ নিচে ঝাঁপ দেবে নাকি উপরে উঠে ডক্টরকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে? ওদিকে নিচেও অপেক্ষা করছে শত্রুপক্ষ। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে তাকে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হবে

সে বিড়বিড় করে বলল, "ওয়া মা রামাইতা ইয রামাইতা ওয়ালাকিন্নাল্লাহা রামা" (তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন)

সে কি পারবে এই চক্রব্যূহ ভেদ করতে? নাকি পেনড্রাইভটি শত্রুর হাতে চলে যাবে?

পরবর্তী অধ্যায়ে আসছেঃ অন্ধকার গলির ধাওয়া ও এক অদৃশ্য সাহায্যকারীর আবির্ভাব

[এই উপন্যাসে বর্ণিত সকল চরিত্র, স্থান এবং ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কাহিনীর প্রয়োজনে কিছু গোয়েন্দা কৌশল ও প্রযুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে রচিত। গল্পের অলঙ্করণে ব্যবহৃত ফিচার ইমেজের কোনো চরিত্রের সাথে যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির চেহারার মিল পাওয়া যায়, তবে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। লেখক কোনো উগ্রতা বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরাই এই গল্পের মূল লক্ষ্য।]

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default